ডিমেনশিয়ায় পরিচর্যা - Alzheimer Society of Bangladesh

Dementia Help Line

Cell No: +8801720 498197
Cell No: +8801857 601061

Email:- info@alzheimerbd.com

ডিমেনশিয়ায় পরিচর্যা

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে বসবাস এবং তাদের যত্ন নেওয়াঃ

পরিচর্যাকারীদের জন্য যেসব জটিল সমস্যার মুখোমুখী হতে ঞয় সেগুলি কিভাবে মোকাবিলা করা যায় সেসব তথ্য প্রদান করা হয়েছে। পরিচর্যাকারীগণ এসব তথ্য ভালভাবে অনুধাবন করতে পারলে নিজে এবং ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি উভয়ে অপেক্ষাকৃত ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন বলে আশা করি। পরিচর্যার কাজটি মাঝে মাঝে খুব কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করার কিছু উপায় আছে। তা নিন্মে দেওয়া হলোঃ

সাধারণ কার্যাবলী ব্যহত না করে রুটিন প্রণয়ন করুনঃ

একটি রুটিন তৈরি থাকলে আপনার প্রতিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাপ কমবে এবং দৈনন্দিন কাজের অনিশ্চয়তা ও অস্বচ্ছতা দূর করে শৃঙ্খলা এবং সফলতা নিয়ে আসবে। এরূপ রুটিন ডিমনেশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধান করবে। যদিও এসব রুটিন বা কর্মতালিকা দৈনন্দিন কাজের সহায়ক তথাপি সেটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক জীবন যাপনের মত রাখার চেষ্টা করতে হবে। যে কোন অবনতিশীল পরিস্থিতিতেও যতদূর সম্ভব তাঁর সঙ্গে রোগাক্রান্ত হওয়ার পূর্বে যে রকম ব্যবহার করা হতো ঠিক সে রকমই ব্যবহার করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে।

কাজগুলো সহজ করে দিনঃ

রোগীর সব কাজগুলো সহজ করে দিন। রোগীকে কোনকিছু পছন্দ করার সুযোগ দিবেন না। এতে রোগী বিভ্রান্ত হতে পারেন।

রোগীকে হাসিখুশী রাখার চেষ্টা করুনঃ

রোগীর সাথে এমন আচরণ করুন যাতে রোগী হাসিখুশী থাকেন। হাসিখুশী পরিবেশ রোগীর স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

রোগী যাতে ব্যথা না পান সেই দিকে খেয়াল রাখুনঃ

রোগীর ঘরে ও সারা বাড়ীতে হালকা ছিমছাম আসবাবপত্র রাখুন। ঘরে কিংবা আশেপাশে এমন কিছু রাখবেন না, যাতে রোগী আহত হতে পারেন।

রোগীকে ব্যায়াম করতে উৎসাহিত করুনঃ

রোগীকে নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করান। ব্যায়াম রোগীকে দৈহিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

রোগীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখুনঃ

রোগ বাড়ার সাথে ক্রমশঃ রোগীর সাথে আপনার ভাব আদান-প্রদান কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে, সেজন্য নীচের উপায়গুলো আপনার সাহায্যে আসবে।

রোগীর দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ঠিক আছে কিনা দেখুন। প্রয়োজনবোধে এসব ঠিক রাখার জন্য ব্যবস্থা নিন। (যেমন- চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করুন)

রোগীর সাথে পরিস্কারভাবে ভাব আদান-প্রদান করার জন্য রোগীর মুখোমুখি বসে, চোখে চোখ রেখে, ধীরে ধীরে কথা বলুন। আপনার সহানুভূতির উষ্ণতা বোঝাবার জন্য মাঝে মাঝে তাকে জড়িয়ে ধরুন। যদি রোগী আপনার এই উষ্ণ স্পর্শ পছন্দ করেন। রোগীর দেহের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করুন। রোগীর দেহের ভাষা থেকে হয়তো আপনাকে অনেক কিছু বুঝে নিতে হবে। আপনার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আকার ইঙ্গিত সম্পর্কেও আপনি সচেতন হন।এমন কিছু শব্দ খুঁজে নিন, যা রোগী সহজে বুঝতে পারে। এতে রোগীর সাথে যোগাযোগ আকর্ষণ করুন, তারপর কথা বলুন।

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষায় সহায়তা প্রদান করুনঃ

মনে রাখবেন আপনি যে ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত্ন নিচ্ছেন তিনি একজন আত্ম অনুভূতিহীন মানুষ। আপনি এবং অন্য কেউ যা বলছেন বা করছেন সেগুলো অসুবিধাজনক হতে পারে। ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার শারিরীক অবস্থার কথা আলোচনা করা পরিহার করুন।

ঘুমে ব্যাঘাতঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি অস্থিরভাবে রাত্রি যাপন করতে পারে এবং পরিবারের সদস্য/সদস্যদের বিরক্ত করতে পারে। একজন পরিচর্যাকারী হিসেবে এটা আপনার কাছে একটা চরম সমস্যার কারণ হতে পারে।

পরামর্শঃ

১. দিনে ঘুমানোর অভ্যাসকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করুন।

২. প্রতিদিন দীর্ঘ পথ হাঁটা এবং দিনের বেলায় অধিক শারিরীক পরিশ্রম করতে ব্যক্তিকে উৎসাহিত করুন।

৩. ঘুমের সময় ব্যক্তিকে যতদূর সম্ভব চিন্তামুক্ত রাখতে চেষ্টা করুন।

পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি ক্ষনে ক্ষনে ভুলে যায় যে সে কি বলেছিল। এর ফলে বার বার সে প্রশ্ন করতে থাকে।

পরামর্শঃ

১. অন্য কিছু ডিমেনশিয়া ব্যক্তিকে দেখতে, শুনতে বা কিছু করতে বলুন এবং তার মনোযোগ ভিন্নমুখী করার চেষ্টা করুন।

২. সাধারণ প্রশ্নের উত্তরগুলো লিখে ফেলুন।

৩. গলা জড়িয়ে আদর করুন এবং স্নেহ দিয়ে নিশ্চিত করুন, অবশ্য যদি তা অশোভন না হয়।

উগ্রতা ও আক্রমণঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি মাঝে মধ্যে উত্তেজিত, উগ্র বা আক্রমনাত্মক হতে পারে। বিভিন্ন কারণের জন্য তিনি এরূপ অবস্থা হতে পারেন। কারণগুলো হলো সামাজিকতা রক্ষা, ভালমন্দ বিচার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা, নিরাপদে বিরূপ অনুভূতি প্রকাশ করার হারিয়ে ফেলা এবং অন্যের প্রতিক্রিয়া ও ক্ষমতা অনুধাবন করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা। পরিচর্যাকারী হিসেবে এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করা সবচেয়ে কষ্টকর।

পরামর্শঃ

১. শান্ত থাকুন এবং ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন না বা হুমকি দিবেন না।

২. তার মনোযোগ অন্য কোন কাজের দিকে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করুন।

৩. তাকে বেশি সান্ত্বনা ও সুযোগ সুবিধা দিন।

৪. প্রতিক্রিয়ার কারণগুলো খুঁজে বের করুন এবং ভবিষ্যতে এগুলো পরিহার করুন।

৫. তিনি যদি প্রায়ই সহিংসতা সৃষ্টি করেন তাহলে আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। সাহায্যের জন্য কারো সাথে কথা বলুন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য আপনার চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন।

ডাইরী বা স্মৃতি সহায়িকার ব্যবহার করুনঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রাথমিক পর্যায়ে কোন বিষয় স্মরণ করতে ডাইরী বা স্মৃতি সহায়িকা সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি এটা বিভ্রান্তি প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। নিচে কিছু সফল উদাহরণ উল্লেখ করা হলোঃ

১. আত্মীয়-স্বজনের বড় এবং স্পষ্টভাবে নামাঙ্কিত ছবি প্রদর্শন করুন। তাহলে আক্রান্ত ব্যক্তি ছবিটির উপর তার মনোনিবেশ করতে পারবে যে ছবিটি কার।

২. বিভিন্ন রং এবং এর উজ্জ্বল কালি দিয়ে বিভিন্ন কক্ষের দরজায় সেগুলির নাম স্পস্টভাবে লিখে রাখুন।

তবে ডিমেনশিয়ার শেষ পর্যায়ে এসব ডাইরী বা স্মৃতি সহায়িকা খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে না।

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির গোসল ও তার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধিঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির গোসল করার কথা ভুলে যেতে পারেন। এমনকি রোগী গোসল করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব নাও করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে রোগীর প্রতি সম্মান বজায় রেখে তাকে সাহায্য করুন।

পরামর্শঃ

১. রোগীকে তার পূর্বের অভ্যাস অনুযায়ী গোসল করান।

২. এমনভাবে গোসল করান যাতে তিনি আনন্দ অনুভব করেন।

৩. পানি ঢেলে গোসল করানোর চেয়ে ঝর্ণার তলায় গোসল করানো সহজতর। কিন্তু রোগীর এতে অভ্যাস না হলে তা করাবেন না।

৪. গোসল করানোর বিষয়টি যতটা সম্ভব সহজ করুন।

৫. রোগীকে জোর করে গোসল করাবেন না।

৬. লক্ষ্য করুন ব্যক্তির দাঁত নিয়মিতভাবে পরিষ্কার আছে কি না।

৭. গোসলের সময় রোগী সংকোচবোধ করলে দেহের প্রয়োজনীয় অংশ ঢেকে রাখুন।

৮. রোগীকে চেয়ারে অথবা টুলে বসিয়ে গোসল করান।

৯. যদি বসে গোসল করা রোগীর অপছন্দ হয় তাহলে রোগীকে দাঁড়িয়ে গোসল করান। আপনি রোগীকে গোসল করাচ্ছেন, এটি যদি রোগী অপছন্দ করেন তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে গোসল করান।

পোশাক পরিধানঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি কিভাবে পোশাক পড়তে হয় তা ভুলে যেতে পারেন। রোগী পোশাক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব নাও করতে পারেন। এই রোগীরা কখনও কখনও অন্যের উদ্ভট পোষাক পরেও বেরিয়ে আসতে পারেন।

পরামর্শঃ

১. পোশাকগুলি যথাযথভাবে পরার জন্য পর পর সাজিয়ে রাখুন।

২. যে পোশাক পরার মধ্যে জটিলতা আছে তা রোগীকে পড়তে দিবেন ন। রোগীকে একা একা পোশাক পরার জন্য উৎসাহিত করুন।

৩. প্রয়োজন মনে করলে একই ধরনের পোশাক সবসময় ব্যবহার করতে দিন।

৪. অমসৃণ রাবার সোলের জুতা পরান।

রান্না-বান্না

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি মধ্য পর্যায়ে রান্না করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে। যদি আক্রান্ত ব্যক্তি একা বাস করে তবে কঠিন সমস্যাসহ আহত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। রুগ্ন শারিরীক অবস্থায় পুড়ে যাওয়ার ও রক্তাক্তের কারণ হতে পারে।

পরামর্শঃ

১. ব্যক্তি কিভাবে তার রান্না-বান্না করবে তা পর্যবেক্ষণ করুন।

২. অংশিদারিত্ব মনে করে রান্না করা উপভোগ করুন।

৩. নিরাপদ যন্ত্র স্থাপন করুন যেমন গ্যাস ও বিদ্যুৎ।

৪. ধারালো বাসন সরিয়ে ফেলুন।

৫. খেতে দিন এবং দেখুন পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছে কিনা।

খাদ্য গ্রহণঃ

ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায়ই ভুলে যান তারা খাবার খেয়েছেন কিনা, অথবা বাসনপত্র কিভাবে ব্যবহার করতে হবে। আলঝেইমার রোগের শেষ পর্যায়ে রোগীকে খাইয়ে দিতে হয়। এমনকি এমন সমস্যা হয় যে, রোগী চিবিয়েও খেতে পারেন না, গিলেও খেতে পারেন না।

পরামর্শঃ

১. রোগীকে আপনার মনে করিয়ে দিতে হতে পারে, কেমন করে খেতে হয়।

২. বিভিন্ন ধরনের খাদ্য রোগীকে খেতে দিন, যেগুলো রোগী বুদ্ধি করে সহজেই খেতে পারবে।

৩. ছোট ছোট গ্রাসে খাওয়ান যাতে রোগী বিষম না খান। রোগের শেষ পর্যায়ে রোগীকে সকল খাবার তরল করে দিতে হবে।

৪. রোগীকে আস্তে আস্তে খেতে বলুন।

৫. রোগীর খাবার গিলে খেতে অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৬. খাবার সময় রোগীর খাদ্য ভাগে ভাগে পরিবেশনে করুন।

৭. রোগীর ঠান্ডা অথবা গরম বোধ নাও থাকতে পারে। গরম খাবার খেতে গিয়ে রোগী মুখ পুড়িয়ে ফেলতে পারেন।

৮. শোবার আগে রোগীকে তরল খাদ্য দিবেন না।

শৌচ-কর্ম এবং মলমূত্র বেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে অসমর্থঃ

কখন টয়লেট (পায়খানা) যেতে হবে তা ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি ভুলে যেতে পারে। টয়লেটটি কোথায় এবং সেখানে গিয়ে কি করতে হবে তাও সে ভুলে যেতে পারে।

পরামর্শঃ

১. তাঁর টয়লেট (পায়খানা) যাওযার বিষয়ে একটি সিডিউল ঠিক করে ফেলুন।

২. উজ্জ্বল রং দিয়ে পায়খানার দরজায় বড় বড় অক্ষরে টয়লেট (পায়খানা) শব্দটি লিখে স্থানটিকে তাঁর কাছে আরো স্পষ্ট করে তুলুন।

৩. টয়লেটের (পায়খানা) দরজাটি খোলা রাখুন যাতে তিনি খুব সহজেই সেটা খুঁজে পান।

৪. কাপড় যেন খুব সহজেই খুলে ফেলতে পারেন সেটা নিশ্চিত করুন।

৫. ঘুমাতে যাবার আগে পানি পান সীমিত করে দিন।

৬. বিছানার পাশে একটি চেম্বার পট বা কমোড স্থাপন করুন, তাতে কিছু উপকার হতে পারে।

প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।